এবং এভাবে তোমাকে তোমার রব মনোনীত করবেন আর তোমার কথার পরিণাম বের করা শিক্ষা দেবেন; এবং তোমার উপর আপন অনুগ্রহ পূর্ণ করবেন আর ইয়া’কূবের পরিবার পরিজনের উপরও, যেভাবে তোমার পূর্বে তোমার পিতা ও পিতামহ ইব্রাহীম ও ইসহাক্ব উভয়ের উপর তা পূর্ণ করেছেন। নিশ্চয়ই তোমার রব সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
যখন তারা বললো, ‘অবশ্যই ইয়ূসুফ ও তার ভাই আমাদের পিতার নিকট আমাদের চেয়ে অধিক প্রিয় অথচ আমরা একটা দল, নিশ্চয় আমাদের পিতা স্পষ্টতঃ তাদের ভালোবাসায় নিমজ্জিত রয়েছেন।
তাদের মধ্যে একজন বক্তা বললো, ‘ইয়ূসুফকে হত্যা করো না এবং তাকে গভীর কূপের মধ্যে নিক্ষেপ করো, যাতে কোন যাত্রী এসে তাকে নিয়ে যায়, যদি তোমরা কিছু করতে চাও’।
অতঃপর যখন তাকে নিয়ে গেলো এবং সবার সিদ্ধান্ত এটাই হলো যে, তাকে অন্ধ কূপে নিক্ষেপ করবে এবং আমি তার প্রতি ওহী প্রেরণ করলাম, ‘নিশ্চয় তাদেরকে তুমি তাদের এ কাজের কথা জানিয়ে দেবে এমনি সময়ে যে, তারা অনুধাবন করতে পারবে না’।
(তারা) বললো, ‘হে আমাদের পিতা! আমরা দৌড়ের প্রতিযোগিতায় দূরে চলে গিয়েছি এবং ইয়ূসুফকে আমাদের মালপত্রের নিকট রেখে গিয়েছি, অতঃপর তাকে নেকড়ে বাঘ খেয়ে ফেলেছে; এবং আপনি কোন মতেই আমাদেরকে বিশ্বাস করবে না যদিও আমরা সত্যবাদী হই’।
১৮. এবং তারা তার জামায় এক মিথ্যা রক্ত লেপন করে নিয়ে এলো। বললো, ‘বরং তোমাদের অন্তরগুলো একটা কাহিনী তোমাদের জন্য সাজিয়ে দিয়েছে; সুতরাং ধৈর্যই শ্রেয়; এবং আল্লাহ্রই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করছি ওই বিষয়ে, যা তোমরা বলছো’।
এবং একটা কাফেলা এলো, তারা তাদের পানি সংগ্রহকারীকে প্রেরণ করলো; অতঃপর সে তার বালতি নামিয়ে দিলো। (সে) বলে উঠলো, ‘আহ্, কেমন সুখবর! এ যে এক কিশোর!’ এবং (তারা) তাকে একটা মূলধন বানিয়ে লুকিয়ে রাখলো; আর আল্লাহ্ সবিশেষ অবহিত সে সম্পর্কেই যা তারা করছে।
এবং মিশরের যে ব্যক্তি তাকে ক্রয় করলো সে তার স্ত্রীকে বললো, ‘তাকে সসম্মানে রাখো, সম্ভবতঃ তিনি আমাদের উপকারে আসবেন অথবা আমরা তাকে পুত্ররূপে গ্রহণ করবো’। এবং এভাবে আমি ইয়ূসুফকে ওই যমীনে প্রতিষ্ঠিত করেছি এবং এ জন্য যে, তাকে কথার পরিণাম শিক্ষা দেবো; আর আল্লাহ্ আপন কার্য-সম্পাদনে পরাক্রমশালী; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।
এবং সে যে স্ত্রীলোকের ঘরে ছিলো সে তাকে প্রলোভিত করলো যেন তার কামনায় বাধা না দেয় এবং দরজাগুলো সবই বন্ধ করে দিলো আর বললো, ‘এসো! তোমাকেই বলছি!’ বললো, ‘আল্লাহ্রই আশ্রয়! সেই ‘আযীয’ তো আমার প্রভু অর্থাৎ লালনকারী। তিনি আমাকে ভালো মতে রেখেছেন; নিশ্চয় যালিমদের মঙ্গল হয় না’।
এবং নিশ্চয় স্ত্রীলোকটা তার কামনা করেছিলো এবং সেও স্ত্রীলোকের ইচ্ছা করতো যদি আপন রবের নিদর্শন না দেখতো। আমি এরূপ এজন্যই করেছি যেন তার থেকে মন্দ ও অশ্লীলতাকে দূরে রাখি। নিশ্চয় সে আমার মনোনীত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।
এবং তারা উভয়ে দরজার দিকে দৌড়ে গেলো এবং স্ত্রীলোকটা তার জামা পেছন থেকে ছিড়ে ফেললো আর তারা উভয়েই স্ত্রীলোকটার স্বামীকে দরজার নিকট পেয়েছিলো। (স্ত্রী লোকটা) বললো, ‘কি শাস্তি হতে পারে তার, যে তোমার গৃহিণীর সাথে কুকর্ম কামনা করে, কিন্তু এ যে, তাকে কারাগারে বন্দী করা হোক কিংবা কষ্টদায়ক শাস্তি।
বললো, ‘সে-ই আমাকে প্রলোভিত করেছে, যেন আমি আত্নসংবরণ না করি; এবং স্ত্রী লোকটার পরিবারের একজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিলো- ‘যদি তার জামার সম্মুখ দিক ছিন্ন করা হয়ে থাকে তবে স্ত্রীলোকটি সত্য কথা বলেছে আর ইনি মিথ্যা বলেছেন।
এবং শহরে কিছু নারী বললো, ‘আযীযের স্ত্রী তার যুবকের হৃদয়কে প্রলোভিত করছে; নিশ্চয় তার প্রেম তার অন্তরকে উন্মত্ত করেছে, আমরা তো তাকে সুস্পষ্ট প্রেম-বিভোর দেখতেপাচ্ছি।
অতঃপর যখন যুলায়খা তাদের এ চর্চা শুনতে পেলো, তখন ওই সব নারীকে ডেকে পাঠালো আর তাদের জন্য আসন প্রস্তুত করলো এবং তাদের প্রত্যেককে একটা ছুরি দিলো আর ইয়ূসুফকে বললো, ‘তাদের সম্মুখে বের হও’।যখন নারীরা ইয়ূসুফকে দেখলো তখন তারা তার মহত্ব বর্ণনা করতে লাগলো এবং নিজেদের হাত কেটে ফেললো আর বললো, ‘আল্লাহ্রই জন্য পবিত্রতা, এটাতো মানব জাতির কেউ নয়, এটাতো নয়, কিন্তু কোনো সম্মানিত ফিরিশ্তা!’
যুলায়খা বললো, ‘এই তো সে, যার সম্বন্ধে তোমরা আমার নিন্দা করছিলে এবং নিশ্চয় আমি তাকে প্রলোভিত করতে চেয়েছি। অতঃপর তিনি নিজেই নিজেকে পবিত্র রেখেছেন; এবং নিশ্চয় যদি তিনি সেই কাজ না করেন, যা আমি তাকে বলছি, তবে অবশ্যই তিনি কারারুদ্ধ হবেন এবং তিনি নিশ্চয় লাঞ্ছনা ভোগ করবেন’।
ইয়ূসুফ আরয করলো, ‘হে আমার রব! আমার নিকট কারগারই অধিক প্রিয় ওই কর্ম থেকে, যার প্রতি তারা আমাকে আহ্বান করছে; এবং যদি তুমি আমাকে তাদের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা না করো তবে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়বো এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো’।
এবং তার সাথে কারাগারে দু’জন যুবক প্রবেশ করলো। তাদের একজন বললো, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম- আমি আংগুর নিংড়িয়ে রস বের করছি। আর অপরজন বললো- আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমার মাথার উপর কিছু রুটি বহন করছি, যেগুলো থেকে পাখী খাচ্ছে। আমাদেরকে এর ব্যাখ্যা বলে দিন! নিশ্চয় আমরা আপনাকে সৎকর্মপরায়ণ দেখছি’।
ইয়ূসুফ বললো, ‘যে খাদ্য তোমরা পেয়ে থাকো, সে খাদ্য তোমাদের নিকট আসার পূর্বেই তোমাদেরকে এর ব্যাখ্যা বলে দেবো। এটা ওই সব জ্ঞান থেকেই, যা আমাকে আমার রব শিক্ষা দিয়েছেন। নিশ্চয় আমি সেসব লোকের ধর্ম মেনে নিই নি, যারা আল্লাহ্র উপর ঈমান আনে না এবং তারা পরকালে অবিশ্বাসী।
এবং আমি আপন পিতৃপুরুষগণ- ইব্রাহীম, ইসহাক্ব এবং ইয়া’ক্বুবের ধর্মকে গ্রহণ করেছি। আমাদের জন্য একথা শোভা পায় না যে, কোন বস্তুকে আল্লাহ্র শরীক স্থির করবো, এটা আল্লাহ্র এক অনুগ্রহ আমাদের উপর এবং মানবকূলের উপর, কিন্তু অধিকাংশ লোক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।
তোমরা তিনি ব্যতীত পূজা করছো না, কিন্তু নিছক কতগুলো নামের, যেগুলো তোমরা এবং তোমাদের পিতৃ-পুরুষগণ গড়ে নিয়েছো; আল্লাহ্ সেগুলোর কোন প্রমাণ অবতারণ করেন নি। কিন্তু নির্দেশ দেবার অধিকার আল্লাহ্রই। তিনি বলেছেন- ‘তিনি ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করো না। এটাই সরল দ্বীন; কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না’।
হে কারা-সঙ্গীদ্বয়! তোমাদের মধ্যে একজন আপন প্রভু (বাদশাহ) কে মদ্যপান করাবে; রইলো অপরজন। তাকে শূলে চড়ানো হবে; অতঃপর পাখী তার মস্তক খাবে। সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে ওই কথারই, যেটা সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসা করছিলে’।
এবং ইয়ূসুফ এদের উভয়ের মধ্যে যে মুক্তি পাবে বলে মনে করলো তাকে বললো, ‘তোমার প্রভু (বাদশাহ) এর নিকট আমার কথা উল্লেখ করো!’ অতঃপর শয়তান তাকে ভুলিয়ে দিলো যে, সে তার প্রভু (বাদশাহ) এর সামনে ইয়ূসুফের কথা উল্লেখ করবে; সুতরাং ইয়ূসুফ আরো কয়েক বছর কারাগারে রইলো।
এবং বাদশাহ বললো, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম-সাতটা মোটা স্থূলকায় গাভী, সেগুলোকে সাতটা শীর্ণকায় গাভী ভক্ষণ করছে এবং সাতটা সবুজ শীষ আর অপর সাততা শুষ্ক। হে সভাষদমণ্ডলী! আমার স্বপ্নের জবাব দাও যদি তোমরা স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে পারো’।
এবং বললো ওই ব্যক্তি, যে এ দু’জনের মধ্য থেকে মুক্তি পেয়েছিলো এবং এক দীর্ঘকাল পরে তার স্মরন হলো, ‘আমি তোমাদেরকে এর ব্যাখ্যা জানিয়ে দেবো আমাকে প্রেরণ করো’।
‘হে ইয়ূসুফ! হে বড় সত্যবাদী! আমাদেরকে ব্যাখ্যা দিন-সাতটা স্থূলকায় মোটা তাজা গাভীর, যেগুলোকে সাতটা শীর্ণকায় গাভী ভক্ষণ করছে এবং সাতটা সবুজ শীষ ও অপর সাতটা শুষ্ক। হয় তো আমি লোকদের নিকট ফিরে যাবো, তো তারা অবগত হতে পারবে’।
এবং বাদশা বললো, ‘তাকে আমার নিকট নিয়ে এসো! অতঃপর যখন তার নিকট দূত এলো তখন সে বললো, ‘আপন প্রভু-বাদশার নিকট ফিরে যাও, অতঃপর তাকে জিজ্ঞাসা করো, কী অবস্থা ওইসব নারীর, যারা তাদের হাত কেটে ফেলেছিলো। নিশ্চয় আমার রব তাদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অবগত আছেন’।
(বাদশাহ) বললো, ‘হে নারীরা! তোমাদের কি কাজ ছিলো, যখন তোমরা ইয়ূসুফের অন্তরকে প্রলোভিত করতে চেয়েছিলে? (তারা) বললো, ‘আল্লাহ্র জন্য পবিত্রতা! আমরা তার মধ্যে কোন দোষ দেখতে পাই নি’, আযীযের স্ত্রী বললো, ‘এখনই আসল কথা প্রকাশ হলো। আমিই তার মনকে প্রলোভিত করতে চেয়েছিলাম এবং তিনি নিঃসন্দেহে সত্যবাদী’।
ইয়ূসুফ বললো, ‘এটা আমি এ জন্য করেছি যাতে আযীয অবগত হয়ে যায় এ মর্মে যে, আমি তার অনুপস্থিতিতে তার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করিনি এবং আল্লাহ্ প্রতারকদের ষড়যন্ত্র সফল হতে দেন না।
এবং আমি নিজ প্রবৃত্তিকে নির্দোষ বলছি না। নিশ্চয় প্রবৃত্তি তো মন্দকর্মের বড় নির্দেশদাতা, কিন্তু যার প্রতি আমার রব দয়া করেন, নিশ্চয় আমার রব ক্ষমাশীল দয়ালু।
এবং বাদশাহ বললো, ‘তাকে আমার নিকট নিয়ে এসো! আমি তাকে বিশেষ করে আমার জন্য নির্বাচিত করে নেবো’। অতঃপর যখন তার সাথে কথা বললো, তখন বললো, ‘নিশ্চয় আজ আপনি আমাদের নিকট সম্মানিত ও নির্ভযোগ্য হলেন’।
এবং এভাবেই আমি ইয়ূসুফকে ওই দেশের উপর ক্ষমতা দান করেছি এর মধ্যে যেখানে ইচ্ছা অবস্থান করবে। আমি আপন দয়া যাকে ইচ্ছা পৌছাই এবং আমি সৎকর্মপরায়ণদের শ্রমফল বিনষ্ট করি না।
এবং যখন তাদের সামগ্রীর ব্যবস্থা করে দিলো তখন বললো, তোমাদের সৎ ভাইকে আমার নিকট নিয়ে এসো। তোমরা কি দেখছো না যে, আমি মাপে পূর্ণ মাত্রায় দিচ্ছি এবং আমি সবার চেয়ে উত্তম অতিথিপরায়ণ?
এবং ইয়ূসুফ নিজ ভৃত্যদেরকে বললো, ‘তাদের মূলধন (পণ্যমূল্য) তাদেরই (মালপত্রের) ঝুলির মধ্যে রেখে দাও হয় তো তারা এটা বুঝতে পারবে যখন তারা আপন ঘরের দিকে ফিরে যাবে হয় তো তারা ফিরে আসবে’।
অতঃপর যখন তারা তাদের পিতার নিকট ফিরে গেলো, তখন বললো, ‘হে আমাদের পিতা! আমাদের জন্য খাদ্য শস্য (এর বরাদ্দ) নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছে; সুতরাং আমাদের ভাইকে আমাদের সাথে পাঠিয়ে দিন,যাতে আমরা রসদ আনতে পারি এবং আমরা অবশ্যই তার রক্ষণাবেক্ষণ করবো’।
বললো, ‘আমি কি তার সম্পর্কে তোমাদেরকে তেমনই বিশ্বাস করবো, যেমনপূর্বে তার ভাই সম্বন্ধে করেছিলাম? সুতরাং আল্লাহ্ সর্বাধিক উত্তম রক্ষণাবেক্ষণকারী এবং তিনি সব দয়ালুর শ্রেষ্ঠ দয়ালু’।
এবং যখন তারা তাদের মালপত্র খুললো, তখন তারা তাদের মূলধন (পণ্যমূল্য) দেখতে পেলো যে, তাদেরকে ফেরত দেওয়া হয়েছে; এবং তারা বললো, ‘হে আমাদের পিতা! এখন আর কি চাইবো- এই হচ্ছে আমাদের মূলধন (পণ্যমূল্য), যা আমাদেরকে ফেরত দেওয়া হয়েছে; এবং আমরা আমাদের ঘরের জন্য খাদ্য সামগ্রী আনবো এবং আমাদের ভাইয়ের রক্ষণাবেক্ষণ করবো আর আমরা অতিরিক্ত আরেক ঊষ্ট্র বোঝাই পণ্য পাবো, এ দান বাদশাহর সম্মুখে কিছুই নয়’।
বললো, ‘আমি কখনো তাকে তোমাদের সাথে পাঠাবো না যতক্ষণ না তোমরা আমার নিকট আল্লাহ্র নামে এ অঙ্গীকার করো যে, অবশ্যই তোমরা তাকে নিয়ে আসবে; কিন্তু যদি তোমরা পরিবেষ্টিত হয়ে পড়ো’। অতঃপর যখন তারা ইয়া’কূবের নিকট প্রতিজ্ঞা করলো তখন বললো, ‘আল্লাহ্রই যিম্মা এ কথার উপর, যা আমরা বলছি’।
এবং বললো, ‘হে আমার পুত্রগণ! তোমরা এক দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে না; বরং ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। আমি তোমাদেরকে আল্লাহ্ থেকে বাচাতে পারি না। নির্দেশ তো সব আল্লাহ্রই। আমি তারই উপর ভরসা করেছি; এবং ভরসাকারীদের তারই উপর ভরসা করা উচিত’।
এবং যখন তারা প্রবেশ করলো যেভাবে তাদের পিতা নির্দেশ দিয়েছিলো সে তো তাদেরকে আল্লাহ্ থেকে কিছুই রক্ষা করতে পারতো না; তবে হ্যাঁ, ইয়া’কুবের অন্তরের একটা অভিপ্রায় ছিলো, যা সে পূর্ণ করে নিয়েছে এবং নিশ্চয় সে জ্ঞানী, আমার শিক্ষা দানের ফলে; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।
এবং যখন তারা ইয়ূসুফের নিকট গেলো, তখন সে আপন সহোদরকে নিজের পাশে স্থান দিলো, বললো, ‘বিশ্বাস করো আমিই তোমার সহোদর, সুতরাং এরা যা কিছু করছে তার জন্য দুঃখ করো না’।
অতঃপর যখন তাদের সামগ্রীর ব্যবস্থা করে দিলো, তখন পেয়ালা সে আপন সহোদরের হাওদার মধ্যে রেখে দিলো, অতঃপর এক ঘোষক চিৎকার করে বললো, ‘হে যাত্রীদল! নিশ্চয় তোমরা চোর’।
অতঃপর সে প্রথমে আপন ভাই এর থলের তল্লাশির পূর্বে তাদের থলে থেকে তল্লাশী শুরু করলো। অতঃপর সেটা তার ভাইয়ের থলে থেকে বের করে নিলো। আমি ইয়ূসুফকে এই কৌশল বলে দিয়েছি। বাদশাহী আইনের মধ্যে তার পক্ষে সম্ভব ছিলো না তার সহোদর আটক করা, কিন্তু যদি আল্লাহ্ ইচ্ছা করেন। আমি যাকে ইচ্ছা মর্যাদায় উন্নীত করি। এবং প্রত্যেক জ্ঞানবান ব্যক্তির উপর আছেন একজন অধিক জ্ঞানী।
ভ্রাতাগণ বললো, ‘যদি সে চুরি করে তবে নিশ্চয় এর পূর্বে তার ভাইও চুরি করেছিলো’। তখন ইয়ূসুফ একথা নিজের মনে গোপন রাখলো এবং তাদের নিকট প্রকাশ করেনি, মনে মনে বললো, ‘তোমরা তো মর্যাদায় হীনতর এবং আল্লাহ্ ভালভাবে জানেন যে কথা তোমরা রচনা করছো’।
অতঃপর যখন (তারা) তার নিকট থেকে নিরাশ হলো, তখন তারা নির্জনে গিয়ে কানাঘুষা করতে লাগলো। তাদের বড়ভাই বললো, ‘তোমরা কি জানো না যে, তোমাদের পিতা তোমাদের কাছ থেকে আল্লাহ্র নামে অঙ্গীকার নিয়েছেন এবং ইতোপূর্বে ইয়ূসুফের ব্যাপারে তোমরা কেমন ত্রুটি করেছিলে? সুতরাং আমি কিছুতেই এ স্থান ত্যাগ করবো না, যতক্ষণ না আমার পিতা আমাকে অনুমতি দেন অথবা আল্লাহ্ আমাকে নির্দেশ দেন এবং তার নির্দেশ সবচেয়ে উত্তম’।
‘তোমরা নিজ পিতার নিকট ফিরে যাও। অতঃপর আরয করো, ‘হে আমাদের পিতা! নিশ্চয় আপনার ছেলে চুরি করেছে এবং আমরা তো এতটুকু কথারই সাক্ষী হয়েছিলাম যতটুকু আমাদের জ্ঞানে ছিলো এবং আমরা অদৃশ্যের রক্ষণাবেক্ষণকারী ছিলাম না।
বললো, ‘তোমাদের মন তোমাদের জন্য কোন বাহান তৈরী করে দিয়েছে; সুতরাং ধৈর্যই শ্রেয়, হয় তো অদূর ভবিষ্যতে আল্লাহ্ তাদের সবাইকে আমার সাথে সাক্ষাৎ করাবেন। নিশ্চয় তিনি-ই সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়’।
অতঃপর যখন তারা ইয়ূসুফের নিকট পৌছালে, তখন বললো, ‘হে আযীয! আমরা ও আমাদের পরিবারবর্গ বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছি এবং আমরা তুচ্ছ পণ্যমূল্য নিয়ে এসেছি; সুতরাং আপনি আমাদের রসদ পূর্ণমাত্রায় দিন এবং আমাদেরকে দান করুন! নিশ্চয় আল্লাহ্ দাতাদেরকে পুরস্কৃত করেন’।
তারা বললো, ‘তবে কি সত্যি সত্যি আপনি-ই ইয়ূসুফ?’ বললো, ‘আমি ইয়ূসুফ এবং এই আমার সহোদর; নিশ্চয় আল্লাহ্ আমাদের উপর অনুগ্রহ করেছেন। নিশ্চয় যে ব্যক্তি পরহেযগারী ও ধৈর্যধারণ করে, তবে আল্লাহ্ সৎকর্মপরায়ণদের শ্রমফল বিনষ্ট করেন না’।
যখন কাফেলা মিশর থেকে বের হয়ে পড়লো, এখানে তাদের পিতা বললো, ‘নিশ্চয় আমি ইয়ূসুফের খুশবু পাচ্ছি, যদি আমাকে তোমরা এ কথা না বলো যে, আমার স্বাভাবিক অবস্থা লোপ পেয়েছে’।
অতঃপর যখন সুসংবাদদাতা উপস্থিত হলো তখন সে জামাটা ইয়া’কুবের মুখের উপর রাখলো। তখনই তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে এলো। বললো, ‘আমি কি বলতাম না যে, আল্লাহ্র সে সব মহিমা আমার জানা আছে, যা তোমরা জানো না?’
অতঃপর যখন তারা সবাই ইয়ূসুফের নিকট পৌছালো, তখন সে আপন মাতা ও পিতাকে নিজের পাশে স্থান দিলো এবং বললো, ‘মিশরে প্রবেশ করুন, আল্লাহ্ যদি চান, নিরাপদ অবস্থায়’।
এবং আপন পিতা ও মাতাকে তার সিংহাসনে বসালো এবং সবাই তার জন্য সাজদায় পড়লো; আর ইয়ূসুফ বললো, ‘হে আমার পিতা! এটাই আমার পূর্বেকার স্বপ্নের ব্যাখ্যা; নিশ্চয় আমার রব সেটা সত্যে পরিণত করেছেন এবং নিশ্চয় তিনি আমার উপর অনুগ্রহ করেছেন যে, আমাকে কারাগার থেকে মুক্ত করেছেন এবং আপনাদের সবাইকে গ্রামাঞ্চল থেকে নিয়ে এসেছেন এরপর যে, শয়তান আমার মধ্যে এবং আমার ভাইদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক নষ্ট করে দিয়েছিলো। নিশ্চয় আমার রব যে বিষয় চান তা সহজ করে দেন। নিশ্চয় তিনিই সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
হে আমার রব! নিশ্চয় তুমি আমাকে একটা রাজ্য দিয়েছো এবং আমাকে কিছু কথার পরিণাম উদ্ঘাটন করার বিদ্যা শিক্ষা দিয়েছো। হে আসমানসমূহ ও যমীনের স্রষ্টা! তুমি আমার কর্মব্যবস্থাপক দুনিয়ায় ও আখিরাতে। আমাকে মুসলমানরূপে উঠাও এবং তাদেরই সাথে মিলাও যারা তোমার একান্ত নৈকট্যের উপযোগী।
এ কিছু অদৃশ্যের সংবাদ, যা আপনার প্রতি ওহী করেছি এবং আপনি তাদের নিকট ছিলেন না যখন তারা নিজেদের কাজের সিদ্ধান্ত পাকাপাকি করেছিলো এবং তারা চক্রান্ত করছিলো।
তবে কি তারা এ থেকে নির্ভীক হয়ে বসে আছে যে, আল্লাহ্র শাস্তি এসে তাদেরকে গ্রাস করে বসবে অথবা ক্বিয়ামত তাদের উপর আকস্মিকভাবে এসে পড়বে, অথচ তাদের খবরই থাকবে না।
আপনি বলুন, ‘এটা আমার পথ, আমি আল্লাহ্র প্রতি আহ্বান করি। আমি অন্তর চক্ষু সম্পন্ন- এবং যারা আমার পদাঙ্ক অনুসরণ করে, আর আল্লাহ্র জন্যই পবিত্রতা, এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।
আর আমি আপনার পূর্বে যতো রসূল প্রেরণ করেছি সবই পুরুষ ছিলো যাদেরকে আমি ওহী করতাম এবং সবাই শহরের অধিবাসী ছিলো। তবে কিএসব লোক যমীনে ভ্রমণ করে না? তবে তো দেখতো তাদের পূর্ববর্তীদের কী পরিণাম হয়েছে। এবং নিশ্চয় পরকালের ঘর পরহেয্গারদের জন্য শ্রেয়। তবে কি তোমাদের বিবেক নাই?
অবশেষে, যখন রসূলগণের নিকট প্রকাশ্য কোন উপায় উপকরণের আশা রইলো না এবং লোকেরা ভাবলো যে, রসূলগণ তাদেরকে ভুল বলেছিলো, তখন আমার সাহায্য এলো। অতঃপর আমি যাকে চেয়েছি তাকে উদ্ধার করা হয়েছে। এবং আমার শাস্তি অপরাধী সম্প্রদায় থেকে রদ্দ করা যায় না।
নিশ্চয়, তাদের খবরাদি দ্বারা বিবেকবানদের চক্ষু খুলে যায়। এটা কোন বানোয়াট কথা নয়; কিন্তুনিজের পূর্ববর্তী বানীগুলোর সত্যায়ন এবং প্রত্যেক বস্তু বিশদ বিবরণ আর মুসলমানদের জন্য হিদায়ত ও রহমত।